নারীর পর্দা গাইড

পর্দা ইসলামে শুধুমাত্র পোশাকের বিষয় নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আধ্যাত্মিক ও সামাজিক বিষয়। নারীর পর্দার মূল উদ্দেশ্য হলো তার সম্মান ও শালীনতা রক্ষা করা, যা কেবল পোশাকের মাধ্যমে নয়, বরং শারীরিক ও সামাজিক বিভিন্ন শর্তাবলীর মাধ্যমে নিশ্চিত হয়। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, নারীর পর্দা তার ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এটি তার আত্মমর্যাদা ও সৎ জীবনযাত্রার প্রতীক।

১. নারীর পর্দার ফরয শর্তসমূহ:

ইসলামে নারীর পর্দা বা পোষাকের ক্ষেত্রে ছয়টি ফরয শর্ত রয়েছে। এই শর্তগুলি নারীর শরীর ও চরিত্রকে শালীন এবং নিরাপদ রাখতে সাহায্য করে।

শরীরের অঙ্গ ঢাকা: পোশাক এমনভাবে হতে হবে যাতে নারীর সমস্ত শরীর ঢাকা থাকে এবং কোন অঙ্গ প্রকাশিত না হয়।

কুরআনের আয়াত:

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ۚ
“হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ এবং মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়।
(সূরা আল-আহযাব: ৫৯)

পোশাক পাতলা না হওয়া: পোশাকটি এমন হতে হবে, যাতে শরীরের আকৃতি বা ত্বক স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান না হয়।

হাদিস:

صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا… نِسَاءٌ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلَاتٌ مَائِلَاتٌ، لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا.

“দুই শ্রেণির মানুষ জাহান্নামী, যাদের একজন হলো—যারা এমন পোশাক পরবে যা পরিধানের পরও নগ্ন থাকবে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।”
(সহীহ মুসলিম: ২১২৮)

আকৃতি না দেখানো:পোশাক এমন হতে হবে যাতে শরীরের কোনো অঙ্গের আকৃতি ফুটে না ওঠে।

হাদিস:

نِسَاءٌ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلَاتٌ مَائِلَاتٌ… لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا

“যে নারী এমন পোশাক পরে যা তার শরীরের আকৃতি ফুটিয়ে তোলে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।”
(সহীহ মুসলিম: ২১২৮)

অত্যাধিক সাজসজ্জা না করা: পোশাকের মধ্যে অহংকার বা আড়ম্বরপূর্ণ সাজসজ্জা পরিহার করা উচিত, যাতে এটি পুরুষদের জন্য আকর্ষণীয় না হয়।

কুরআনের আয়াত:

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ.

“তোমরা (নারীরা) ঘরে অবস্থান কর এবং জাহেলি যুগের মতো প্রকাশ্যে সাজসজ্জা করো না।”
(সূরা আল-আহযাব: ৩৩)

পুরুষের পোশাকের মতো না হওয়া: নারীর পোশাক পুরুষের পোশাকের মতো হতে পারবে না। নারীর জন্য পুরুষদের পোশাক পরিধান করা হারাম।

হাদিস:

لَعَنَ اللَّهُ الْمُتَشَبِّهِينَ مِنَ الرِّجَالِ بِالنِّسَاءِ وَالْمُتَشَبِّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ بِالرِّجَالِ

“পুরুষ যারা নারীর মতো এবং নারী যারা পুরুষের মতো হতে চায়, তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।”
(সুনান আবু দাউদ: ৪০৯৮)

অন্যদের জন্য আড়াল: পোশাক এমন হতে হবে যেন নারীর শরীর বা সৌন্দর্য অন্যদের কাছে প্রকাশিত না হয় এবং তা পর্দা হিসেবে কাজ করে।

“يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ قُل لِّأَزۡوَٲجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ يُدۡنِينَ عَلَيۡهِنَّ مِن جَلَـٰبِيبِهِنَّ…”

“হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ এবং মুমিন নারীদের বলুন তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়।
সূরা আল-আহযাব (৩৩:৫৯)

২. পর্দার অন্যান্য অংশ:

পোশাক ছাড়াও, নারীর পর্দার ক্ষেত্রে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় :-

ঘরের মধ্যে অবস্থান:

পর্দার সবচাইতে প্রথম অংশ হলো যে, নারী অত্যাবশ্যকীয় কোনো প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাবে না। ঘরে অবস্থান করে তারা পর্দা রক্ষা করবে এবং অশালীনতা থেকে দূরে থাকবে।
কোরআনে বলা হয়েছে:

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ°

“তোমরা ঘরে অবস্থান কর এবং পূর্বযুগের অজ্ঞতার মতো সাজসজ্জা করো না।”(সূরা আল-আহযাব: ৩৩)

ফ্রী মিক্সিং থেকে পর্দা:

অর্থাৎ পরিপূর্ণ বোরকা পরিধান করলেও একজন নারী পরপুরুষের মাঝে অবস্থান করবে না। গাইরে মাহরাম পুরুষ থেকে সে সর্বদা নিজেকে দূরে রাখবে। এমনকি বাড়ির ভেতরের গাইরে মাহরাম পুরুষদের থেকেও।
কোরআনে বলা হয়েছে:

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ°

“তোমরা ঘরে অবস্থান কর এবং পূর্বযুগের অজ্ঞতার মতো সাজসজ্জা করো না।”(সূরা আল-আহযাব: ৩৩)

হাদিস:

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم:
“لا يخلونَّ رجلٌ بامرأة إلا مع ذي محرم.”

“কোনো পুরুষ যেন একা কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে না থাকে, তবে তার সাথে মাহরাম থাকতে হবে।”
(صحيح البخاري: ٥٢٣٣, صحيح مسلم: ١٣٤١)

চোখের পর্দা:

দৃষ্টির হেফাজত করাও পর্দার একটি অংশ। ঘরের মধ্যে হোক, কিংবা ঘরের বাইরে, কোনো নারী কোনো পরপুরুষের দিকে বাসনার সাথে তাকাবে না।নারীকে গাইরে মাহরাম পুরুষের দিকে বাসনার সাথে তাকানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি।
কোরআনে বলা হয়েছে:

وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ°

“আর আপনি মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে।”(সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩১)

কন্ঠের পর্দা:

গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথে বিনা প্রয়োজনে সে কথা বলবে না। আর অত্যাবশ্যকীয় কোনো প্রয়োজনে কথা বলতে হলে সে গাম্ভির্যের সাথে কথা বলবে। কখনোই মোলায়েম কণ্ঠে/ মিষ্টি কণ্ঠে/ ন্যাকামি কণ্ঠে কথা বলবে না।
কোরআনে বলা হয়েছে:

فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا°

“তোমরা (নারীরা) কথাবার্তায় কোমলতা প্রকাশ করবে না, যাতে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে লালসা পোষণ করে। বরং তোমরা সম্মানজনক ও শালীন ভাষায় কথা বলো।” (সূরা আল-আহযাব: ৩২)

সফরের পর্দা (মাহরাম ছাড়া সফর নিষিদ্ধ):

অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনে নারীকে সফর করতে হলে, সে সর্বদা তার কোনো মাহরাম পুরুষের সাথে সফর করবে। সে কখনোই একাকী কিংবা কোনো গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথে সফর করবে না।

হাদিস:

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم:
“لا تسافر امرأة إلا مع ذي محرم.”

“কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া সফরে না যায়।”
(صحيح البخاري: ٣٠٦٥, صحيح مسلم: ١٣٥٠)

নির্জনতা থেকে পর্দা (গাইরে মাহরামের সাথে একান্তে থাকা নিষিদ্ধ):

নিজের কোনো মাহরাম পুরুষ ছাড়া সে অন্য কোনো গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথে এমনভাবে অবস্থান করবে না, যাতে সেখানে কেবল তারা দু’জনেই থাকে।

হাদিস:
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم:
“لا يخلونَّ رجلٌ بامرأة إلا مع ذي محرم.”

“কোনো পুরুষ যেন একা কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে না থাকে, তবে তার সাথে মাহরাম থাকতে হবে।”
(صحيح البخاري: ٥٢٣٣, صحيح مسلم: ١٣٤١)

সুগন্ধী থেকে পর্দা:

নারী সুগন্ধী মেখে এমন জায়গায় যাবে না, কিংবা এমন জায়গায় অবস্থান করে সুগন্ধী মাখবে না, যাতে করে স্বামী ছাড়া সুগন্ধীর ঘ্রাণ অন্য কেউ পেয়ে যায়।

হাদিস:

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم:
“إذا استعطرت المرأة فمرّت على القوم ليجدوا ريحها فهي زانية.”

“যখন কোনো নারী সুগন্ধি ব্যবহার করে এবং সে এমন একটি গোষ্ঠীর সামনে দিয়ে চলে যায় যাতে তারা তার সুগন্ধি পায়, তবে সে একটি ব্যভিচারিণী হিসেবে গণ্য হয়।”
(صحيح مسلم: ٢١٢٨)

ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর পর্দা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি, যা তার শালীনতা, নিরাপত্তা এবং সম্মান রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি। কোরআন এবং হাদিসের নির্দেশনা অনুসরণ করে, নারী তার দৃষ্টিভঙ্গি, পোশাক, আচরণ ও উচ্চারণ এবং সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে পর্দা পালন করবে, যা তাকে একজন সম্মানিত এবং মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তুলবে।

তামজিদ হোসেন জিলানী
২৭ রজব, ১৪৪৬ হিজরী, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৫।

| জনপ্রিয় আর্টিকেল

| সাম্প্রতিক আর্টিকেল

প্রাকৃতির সৌন্দর্য

পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তায় এগোতে থাকি, তখন চারপাশ যেন একেবারে নতুন এক জগত খুলে দেয়। ডানদিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে

মসজিদের মাইক ব্যবহার করা প্রসঙ্গে।

‎বরাবর          ‎মাননীয় মুফতিয়ানে কেরাম দা.বা.         ‎উচ্চতর ফিক্বাহ্ ও ইসলামি আইন গবেষণা বিভাগ। জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর ফটিকছড়ি চট্টগ্রাম বাংলাদেশ।‎‎বিষয়:

| ক্যাটাগরি

Scroll to Top