
কিছু মুসলিমকে মাঝে মাঝে এমন একটি ভয়ঙ্কর কথা বলতে শোনা যায়—“আমি দাড়ি-টুপিওয়ালা মানুষ দেখতে পারি না।” এটি নিছক একটি ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য নয়; বরং এটি একটি গভীর ঈমান বিধ্বংসী অভিব্যক্তি। কারণ, এই বাক্যের মধ্যে দ্বীনদার মানুষের প্রতি বিদ্বেষ ও নবীজীর সুন্নতের প্রতি অবজ্ঞার সুর স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।
দাড়ি-টুপি নিছক বাহ্যিক কোনো চিহ্ন নয়। এটি ইসলামি পরিচয়ের নিদর্শন এবং আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের অনুসরণ। এই চিহ্নগুলোকে ঘৃণা করা, অপছন্দ করা, কিংবা প্রকাশ্যে অবজ্ঞা করা কোনোভাবেই একজন মুমিনের জন্য শোভনীয় হতে পারে না।
নবীজীর নির্দেশনা এবং সুন্নতের মর্যাদা ইসলামে দাড়ি রাখা ওয়াজিব এবং এটি সরাসরি নবীজীর নির্দেশ। হাদীস শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে:أَنَّهُ أَمَرَ بِإِحْفَاءِ الشَّوَارِبِ، وَإِعْفَاءِ اللِّحْيَةِঅর্থ: “আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মোচ ছাঁটার এবং দাড়ি লম্বা করার নির্দেশ দিয়েছেন।”(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৫৯)
আরেক হাদীসে বলা হয়েছে:خَالِفُوا الْمُشْرِكِينَ: وَفِّرُوا اللِّحَى، وَأَحْفُوا الشَّوَارِبَ
অর্থ: “মুশরিকদের বিরোধিতা কর। দাড়ি বড় কর এবং মোচ ছাঁটো।”(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৮৯২)
এমনকি অগ্নিপূজকদের সাদৃশ্য থেকে বাঁচার নির্দেশনা দিয়ে নবীজী বলেন:جُزُّوا الشَّوَارِبَ، وَأَرْخُوا اللِّحَى، خَالِفُوا الْمَجُوسَ
অর্থ: “মোচ ছাঁটো এবং দাড়ি বড় কর; অগ্নিপূজকদের বিরোধিতা কর।”(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬০)
দাড়ি এবং টুপি পরিধান কেবল ব্যক্তিগত আমল নয়; এটি ইসলামি সংস্কৃতি ও আদর্শের পরিচায়ক। এমন অবস্থায়, দাড়ি-টুপি নিয়ে ব্যঙ্গ করা বা এটি অপছন্দ করা সরাসরি নবীজীর সুন্নতের প্রতি বিদ্বেষ প্রদর্শন।ঈমানের জন্য বিপদজনক অবস্থান দাড়ি-টুপিওয়ালা মানুষকে অপছন্দ করার মধ্যে যদি কোনো ব্যক্তি দ্বীনদার মানুষের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, তবে তা তার ঈমানের জন্য চরম বিপদ। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
অর্থ: “যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই একজন।”(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ৪০৩১) একজন মুমিনের জন্য ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো, তার অন্তরে আল্লাহ এবং রাসূলের আদর্শের প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য রয়েছে কিনা। নবীজী এবং তাঁর সাহাবিদের আদর্শ গ্রহণ করাই ঈমানের প্রকৃত পরিচয়।
তাই যারা দাড়ি-টুপির মতো সুন্নতকে ঘৃণা করে, তাদের অন্তর কীভাবে সুস্থ ঈমান ধরে রাখতে পারে?
মানসিকতা পরিবর্তনের প্রয়োজন
যদি কোনো ব্যক্তি দাড়ি-টুপিওয়ালা মানুষকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অপছন্দ করে, তবে এটি একটি সংশোধনযোগ্য বিষয়। তাকে বোঝানো সম্ভব যে, কারও ব্যক্তিগত আচরণের কারণে তার মতো সকল মানুষের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। কিন্তু যদি এই বিদ্বেষ দাড়ি-টুপি তথা ইসলামি নিদর্শনের প্রতি হয়, তবে এটি ঈমানহীনতার প্রমাণ।
একজন মুসলিমের উচিত নিজের পছন্দ-অপছন্দের মানদণ্ডকে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা।
উপসংহার
আমাদের সকলের উচিত নিজেদের অন্তরকে পরীক্ষা করা। দাড়ি-টুপি বা ইসলামি চিহ্নগুলোর প্রতি বিদ্বেষ আমাদের ঈমানের জন্য মারাত্মক হুমকি। আমাদের পছন্দ-অপছন্দের মানদণ্ড হতে হবে আল্লাহ এবং রাসূলের নির্দেশনা। কোনো ব্যক্তিগত প্রবৃত্তি বা সাংস্কৃতিক প্রভাব যেন ইসলামের নিদর্শনগুলোকে অগ্রাহ্য করার কারণ না হয়।আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা, নবীজীর সুন্নতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সঠিক ঈমান বজায় রাখার তাওফীক দান করুন। আমীন।